লন্ডন আমার স্বপ্নের শহর

193
0
London

ক্লান্তি দূর করে স্বস্তির নিঃশ্বাসকে প্রশস্ত করে ভ্রমণ। ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষের সামাজিকতা, ভদ্রতা, আচার-আচরণ সম্পর্কে সম্যক শিক্ষা দেয় ভ্রমণ। তাই বছরের পর বছর লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে লন্ডনের ভিসার জন্য আবেদন করি।

আমার কাছে আবেদনটা মনে হয়েছে একটি লটারি পাওয়ার মতো। কারণ আমাদের প্রত্যেকের জানা আছে লন্ডনের ভিসার জটিলতা সম্পর্কে। আবেদনের সাথে পাসপোর্ট ও ভিসা ফি জমা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসা অফিস ইমেইল পাঠায় আমাকে পাসপোর্ট ফেরত আনতে। যথারীতি দেরি না করে চলে গেলাম পাসপোর্ট ডেলিভারি অফিসে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে ভেতরে প্রবেশ করতেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাকে একটা পার্সেল ধরিয়ে দিয়ে ইতালিয়ান ভাষায় বললেন সালাম (চাও)। স্বপ্ন পূরণ করতে কৌতুহল আরও বেড়ে গেল। পার্সেল খুলেই দেখি গ্রেট ব্রিটেনের ভিসা। স্বপ্ন পূরণ শুরু হলো। বাকিটা লন্ডন পৌঁছানোর পর। এবার অপেক্ষা কবে যাব লন্ডন।

London 1

অপেক্ষার পালাও শেষ ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি লন্ডনের উদ্দেশ্যে ইতালি ত্যাগ করলাম। বিমানে উঠেই ভীষণ আনন্দে মনটা ভরে গেল। চামপিনো বিমানবন্দর থেকে ৫টা ২০ মিনিটে বিমান ছাড়লে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিটের মধ্যে লন্ডন স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। খুব একা একা মনে হলো, একদিকে আনন্দ আর অন্যদিকে নতুন একটি জায়গা। অপরিচিত রাস্তায় এক প্রকার বিষন্নতাও কাজ করছিল।

তবু পথ চলতে লাগলাম। ইমিগ্রেশনের কাছে আসতেই মাসুদ নামের এক ইতালিয়ান পাসপোর্টধারীকে পেয়ে গেলাম। ক্ষণিকের মধ্যে মনে চাঞ্চল্য ফিরে আসল। এবার ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতার পালা। নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ালাম। অ্যারাইভাল কার্ডসহ প্রয়োজনীয় কাজগপত্র নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট দাঁড়ানোর পর ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে ডাকলেন, কয়েকটি প্রশ্ন করেই থ্যাংকস বলে ছেড়ে দিলেন।

ওদিকে ইতালি অভিবাসী মাসুদ আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমি ইমিগ্রেশন পার হতেই তিনি ফের ডাক দিলেন। আনন্দ হলো, তার বাসা আর আমার গন্তব্য কাছাকাছি। স্বপ্ন আর স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। ছুটলাম বাস টার্মিনালে। ন্যাশনাল এক্সপ্রেসের দুইটা টিকিট নিলাম ১৬ পাউন্ড দিয়ে। আধাঘণ্টা পর বাস ছাড়ল স্ট্র্যাটফোর্ড স্টেশনের দিকে। আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টায় পৌঁছালাম।

এরপর ইলফোডের উদ্দেশ্যে ৮৬ নম্বর বাসে উঠলাম। আমি ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে গন্তব্যে এসে পড়লাম। আর মাসুদ চলে গেলেন তার গন্তব্যে। এরই মধ্যে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী শ্রদ্ধাভাজন আহমেদ হাসান ম্যানোর পার্কে অপেক্ষা করছেন। আমি সেখানে নেমে তাকে পেয়ে যাই। এরপর চলে গেলাম বাসায়। রাত প্রায় দশটা। ফ্রেশ হয়ে হাসান ভাই, ভাবী, তাদের ছেলে-মেয়েসহ সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমাতে বেজে গেল রাত ১২টা।

চিন্তা একটাই সকাল কখন হবে। আমাকে ভ্রমণ করতে হবে। সময়টা বেশ ভালো। হাসান ভাইয়ের ছেলে তানভীরের কলেজ বন্ধ। তাই তাকে নিয়ে এদিক-সেদিক যাওয়ার অনুমতি পেলাম। ১৬ জানুয়ারি শনিবার ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। ইতালির মাইনাস তাপমাত্রা আমার সহ্য হলেও লন্ডনের ঠাণ্ডা আমাকে প্রচণ্ড ভাবে কাবু করেছে। এত ঠাণ্ডা যে, রাতে ঘুমাতেও অনেকটা কষ্ট হয়েছে। তবু কষ্ট লাগেনি মনে।

London 3

কারণ, এটাই ছিল প্রথম লন্ডন সফর। সবাই একসাথে নাস্তা খেলাম। আমি আর তানভীর আহমেদ দ্রুত তৈরি হলাম লন্ডন শহর ঘুরে বেড়াবো বলে। যথারীতি বাসা থেকে বাস স্টপেজে এলাম। অপেক্ষার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস চলে আসল। আমরাও উঠে পড়লাম। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে স্ট্যামফোর্ড স্টেশন এসে নামলাম। সেখান থেকে আবার আরেকটি বাসে উঠে সরাসরি এলাম চোখ ধাঁধাঁনো, মনের প্রশান্তির জন্য পর্যটনদের বিশেষ আর্কষণ সেন্ট্রাল লন্ডনে। লন্ডন আমার স্বপ্নের শহর।

সেখান থেকে আর্কষণীয় মনোরম দৃশ্যবলি শুরু। লন্ডন ব্রিজের ওপর বেশ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। নিচেই বহমান সেই বিখ্যাত টেমস নদী। লন্ডন ব্রিজ বলতে আমরা বুঝি টেমস নদী। কারণ লন্ডন শহর গড়ে উঠেছে এই নদীতীরে। আর সেতুটি নির্মিত হয়েছে ৪২ বছর আগে ১৭ মার্চ ১৯৭৩।

সন্ধ্যায় যাত্রীরা এর উপর দিয়ে পারাপার হয়। রাতের সৌন্দর্য্য দেখার জন্য। শেষ রাতে লন্ডন ব্রিজ দারুণ আলোয় উদ্ভাসিত হয়। লন্ডন সেতুর অদূরে শহর। আমরা দু’জনে মনের সুখে ব্রিজের উপর হাঁটলাম, পাশে দেয়ালে খোদাই করা লন্ডন ব্রিজ লিখা যেখানে, সেখানে ছবি তুললাম। এরপর সেতুর পাশ ঘেঁষে হাঁটা শুরু করলাম লন্ডন টাওয়ার ব্রিজের দিকে। পথিমধ্যে দেখলাম গ্রেট ব্রিটেনের ঐতিহাসিক যুদ্ধ জাহাজ যা সংরক্ষণ করে বর্তমান এটি জাদুঘর হিসেবে রাখা হয়েছে।

প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আগত পর্যটকরা ভিড় করে আড়াইশ’ বছরের পুরনো যুদ্ধজাহাজ দেখতে। তারই পথ ধরে আমি আর তানভীর ৩২ পাউন্ড দিয়ে দুটি টিকিট নিলাম, সেই সাথে দুটি ওয়াকিটকি। রয়্যাল নেভির এত বড় জাহাজে পথ হারিয়ে গেলে যেন কল করা যায়। যাই হোক দুই-তিন ঘণ্টা ঘুরেও পুরো জাহাজ দেখা শেষ করা সম্ভব হয়নি। এর ভেতরে একটি উন্নত হাসপাতাল, একটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে যা যা প্রয়োজন সবই আছে।

বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যবস্থার কী নেই? অপারেশন থেকে শুরু করে  দাঁতের চিকিৎসা সেবাও রয়েছে এর ভেতরে। এ যেন এক আশ্চর্য আবাসস্থল। সম্পূর্ণ একটি নিরাপদ ব্যবস্থা। যা যা পেলাম ভেতরে অপারেশন রুম, দাতব্য চিকিৎসালয়, রান্না ঘর, রোগীদের বেড, বার, মিট শপসহ অন্যান্য সকল ব্যবস্থাই রয়েছে বিশাল ওই যুদ্ধজাহাজে। ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত রয়্যাল নেভির এ জাহাজ।

London 4

সময়ের রেশ ধরে চলতে হয়। তাই ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধজাহাজ থেকে একটু পাঁয়ে হাটলেই আরেক ঐতিহাসিক লন্ডন টাওয়ার ব্রিজ। সেই টেমস নদীর উপর বহমান বিশ্ব খ্যাত টাওয়ার। এখানে প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। এর উত্তরে টাওয়ার হ্যামলেটস এবং দক্ষিণে রয়েছে সাউথওয়ার্ক। টাওয়ার ব্রিজের উপর উঠলে পুরো লন্ডন শহর দেখা যায়। যার ফলে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল টাওয়ারে ওঠার।

তাই ১৫ পাউন্ড দিয়ে দুটি টিকিট কিনে ভেতরে প্রবেশ করলাম, ২১৩ ফিট উচ্চতার সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। সত্যি পুরো লন্ডন শহরের সৌন্দর্য উপর থেকে চোখে ভাসমান। একটি আশ্চর্য ব্যাপার হলো, টাওয়ারের ওপরে ২৮ ফিট চলার পথ স্বচ্ছ কাঁচের, যার ফলে নিচে নদীর ধীরে বহমান স্রোত খুব সহজেই দেখা যায়। কেউ আবার ভয়ে কাঁচের ওপর দিয়ে হাঁটতে ভয় পান বলে কার্নিশ ঘেঁষে চলেন।কেউ আবার নিচে তাকাতেও ভয় পান। এর চারদিকে অপরূপ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। যেদিকে চোখ যায় নয়ন জুড়িয়ে যায়। ব্রিটিশ ইতিহাস বর্ণনা করার কিছু নেই। এর শুরু আছে শেষ কোথায় জানা নেই।

লন্ডন ভ্রমণের সেই দিনগুলো ভেবে আমার শ্রদ্ধাভাজনদের খুব মনে পড়ে।কর্মব্যস্ততার মাঝেও আমার প্রতি তাদের যে ভালোবাসা তা ভোলার নয়। আমি কৃতজ্ঞ রোম থেকে প্রকাশিত মাসিক স্বদেশ বিদেশ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ইকবাল হোসেন, শ্রদ্ধেয় মেজবাউল ইসলাম বাবু, ইউরোপের জনপ্রিয় সংঙ্গীত শিল্পী শতাব্দী কর ও রতন করের প্রতি। তারা লন্ডনে ভ্রমণকালে নানাভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের কারণে আমি স্বপ্নের লন্ডন শহর ভ্রমণ করে আত্মতৃপ্তি পেয়েছি।

লিখেছেনঃ জমির হোসেন – সূত্রঃ Jagonews24

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!