রোমানিয়া, নিভৃতে থাকা ইউরোপের বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের গল্প

283
0
ছবির মতো অপরূপ সুন্দর রোমানিয়া
ছবির মতো অপরূপ সুন্দর রোমানিয়া। ছবি: সংগৃহীত

আজ এমন এক দেশ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে, যা অনেকের কাছে ‘কান্ট্রি অব ড্রাকুলা’ কিংবা ভ্যাম্পায়ারের দেশ নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি দেশ, যেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আইন করে কালো জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখানকার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষের উদ্যমতায় ওয়েলেসের যুবরাজ হিসেবে পরিচিত চার্লস এতটাই মুগ্ধ যে তিনি মাঝেমধ্যেই বেড়াতে আসেন। দারুণ এবং অদ্ভুত সুন্দর দেশটির নাম রোমানিয়া।

ইউরোপের অনেকের কাছে রোমানিয়া জিপসি অর্থাৎ যাযাবরের দেশ হিসেবেও পরিচিত। তবে ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ভুল। ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তর ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী, যাদের নৃতাত্ত্বিকভাবে রোমা নামে অভিহিত করা হয়, তাদের সঙ্গে রোমানিয়ানদের অনেকে এক করে ফেলে দুটি নামই কাছাকাছি হওয়ার কারণে। রোমানিয়া নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই। কারণ যে কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করেছি, আমার চোখে সেরা হচ্ছে রোমানিয়া। এখানকার সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা, বন্ধুবৎসলতা আর আন্তরিকতা যে কারও মন ভোলাতে বাধ্য। ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিবেচনায় অনেকে রোমানিয়াকে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।

রোমানিয়া শব্দটি এসেছে লাতিন ‘রোমানাস’ থেকে, যার অর্থ ‘সিটিজেনস অব রোম’ বা রোমের অধিবাসী। ১৮৭৭ সালে রোমানিয়া অটোমান শাসকদের হাত থেকে মুক্ত হয় এবং ১৮৮১ সালে ‘কিংডম অব রোমানিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী রোমানিয়ার জনসংখ্যা ১৯ দশমিক ৭১ মিলিয়নের কাছাকাছি, যেখানে এ জনসংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের মতো মানুষ খ্রিষ্টধর্মে (মূলত অর্থোডক্স খ্রিষ্টান) বিশ্বাসী। রোমানিয়ার বেশির ভাগ মানুষই রোমানিয়ান নামক Ethnic গোষ্ঠীর সদস্য। তবে, দেশটিতে হাঙ্গেরিয়ান, জার্মান, রোমা, ইউক্রেনিয়ান এসব Ethnic গোষ্ঠীর মানুষও রয়েছে। শহরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষেরা সাধারণত পাশ্চাত্য ভাবধারার পোশাক পরিধান করে থাকেন। তবে গ্রামাঞ্চলের দিকে বসবাস করা মানুষেরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করতে বেশি ভালোবাসে। রোমানিয়ায় মেয়েদের চুল দেখে বলে দেওয়া যায় যে সে বিবাহিত নাকি অবিবাহিত। অবিবাহিত মেয়েরা চুল খোলা রাখতে পছন্দ করে এবং সাধারণত চুলে বেণি গাঁথে। আর বিবাহিত নারীরা মারামা নামক একধরনের কাপড় দিয়ে চুল ঢেকে রাখে।

রোমানিয়ার জাতীয় পতাকার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নীল, হলুদ ও লাল রং আছে, যা ট্রান্সসিলভানিয়া, মলদাভিয়া ও ওয়ালাসিয়া—এ তিনটি ভিন্ন স্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে। এ তিনটি স্থান দেশটির ঐতিহাসিক একতার পরিচয় বহন করে।

রোমানিয়ার রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরের নাম বুখারেস্ট, যা দেশটির শিল্প, সাহিত্য, বাণিজ্যসহ যাবতীয় প্রসাশনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার বিবেচনায় বুখারেস্ট ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। রোমানিয়ার সংসদ যা রোমানিয়ার স্থানীয় ভাষায় পার্লামেন্টুল রোমানিয়েই নামে পরিচিত, বুখারেস্টে অবস্থিত। এ পার্লামেন্ট ভবনটি পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম নির্মাণ। এর আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত পেন্টাগনের বিল্ডিং রয়েছে। রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টকে পৃথিবীতে এযাবৎকাল পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে ভারী নির্মাণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্লামেন্ট। অসাধারণ নির্মাণশৈলীর স্থাপত্যকলা, শহরের গঠন এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এর সঙ্গে বিদ্যমান সাহিত্য এবং চিত্রকলার অপরূপ মেলবন্ধনের কারণে বুখারেস্ট পূর্ব ইউরোপের প্যারিস নামেও ডাকা হয়।

রোমানিয়ার অবস্থান

প্রায় ৯২,০৪৫.৬ বর্গমাইল জায়গাজুড়ে থাকা রোমানিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সবচেয়ে বড় দেশ। আয়তনে এটি ইউরোপ মহাদেশের দ্বাদশ বৃহত্তম রাষ্ট্র। যেখানে দেশটির দক্ষিণে বুলগেরিয়া, পশ্চিমে সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরি আর পূর্বে ইউক্রেন এবং রিপাবলিক অব মলদোভা অবস্থিত। এ ছাড়াও দেশটির দক্ষিণ–পূর্বের প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার রেখা বরাবর কৃষ্ণসাগরের (ব্ল্যাক সি) উপকূল রয়েছে। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দানিয়ুর অস্ট্রিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, রিপাবলিক অব মলদোভা এবং ইউক্রেন—এ নয়টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রোমানিয়ায় এসে কৃষ্ণসাগরের কাছে দানিয়ুব ডেল্টা নামক বদ্বীপ তৈরি করেছে। বদ্বীপটি পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জীববৈচিত্র্যসম্পন্ন এবং স্থিতিশীল জলাভূমির মধ্যে একটি। এখানকার আপুসেনি পর্বতমালার নিম্নাংশে অবস্থিত স্কারিশোয়ারা নামক হিমবাহটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ হিমবাহ, যা আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো বলে মনে করা হয়। কার্পাথিয়ান পর্বতমালার পূর্ব ও দক্ষিণাংশ রোমানিয়ার মধ্যভাগে অবস্থিত। ইউরোপ মহাদেশের প্রায় সবচেয়ে বেশি অঞ্চলজুড়ে বিরাজমান অনিয়মিত বন-জঙ্গলগুলো একমাত্র এ রোমানিয়ায় পড়েছে। এসব বনজঙ্গল বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। ব্রাউন বিয়ার বা বাদামি ভালুকের জন্য রোমানিয়া বিখ্যাত এবং রাশিয়ার অংশটুকু বাদ দিলে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্রাউন বিয়ার রোমানিয়াতেই পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত পর্যটনকেন্দ্রগুলো বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আর এ কারণে তাই পর্যটনশিল্প বা ট্যুরিজম বর্তমানে রোমানিয়ার অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আঙুর, আপেল, সরিষা এবং বিভিন্ন সবজি থেকে প্রস্তুতকৃত তেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফার্মাসিউটিক্যাল, কেমিক্যাল, লৌহ এবং ইস্পাত শিল্প, মেশিনারি শিল্প, বস্ত্রশিল্প এবং মোটরগাড়ি তৈরির কারখানার মতো ভারী শিল্প রোমানিয়ার অর্থনীতিকে করেছে অত্যন্ত বেগবান। প্রকৃতি থেকে পাওয়া প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেলসম্পদ এবং পৃথিবীতে জমা থাকা স্বর্ণের এক বিশাল ভান্ডার রোমানিয়ায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রোমানিয়া পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ওয়াইন প্রস্তুতকারক দেশগুলোর মধ্যে একটি। বিখ্যাত মোটরগাড়ি প্রস্তুত কোম্পানি ‘ডাসিয়া’র সদর দপ্তর রোমানিয়ার মিওভেনিতে।

জাতীয় মুদ্রার নাম রোমানিয়ান লিউ। লিউ শব্দের অর্থ হচ্ছে সিংহ। এক রোমানিয়ান লিউ সমান শূন্য দশমিক ২১ ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৯ টাকার মতো। পূর্ব ইউরোপে প্রচলিত মুদ্রাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রোমানিয়ান লিউকে সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। পলিমারের তৈরি রোমানিয়ান লিউয়ের প্রতিটি নোটই আলাদা শিল্পকর্ম।

ইউরোপের অন্য দেশগুলোর (যেমন: জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইজ্যারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম) থেকে রোমানিয়া তুলনামূলকভাবে কম সচ্ছল অর্থনীতির দেশ। এ কারণে জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানও ইউরোপের অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে নিম্ন। তবে রোমানিয়ার মানুষেরা খুবই পরিশ্রমী এবং এ জন্য দেশটি খুব দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সব সাধারণ এবং পরিশ্রমী জনগোষ্ঠীর কারণে দেশটি নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও একতা বজায় রাখতে পেরেছে। বর্তমানে রোমানিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর মতো প্রতিপত্তিশালী সংস্থাগুলোর সদস্য এবং শিগগিরই বুলগেরিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে রোমানিয়া সেনজেনভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে।

রোমানিয়ার মুদ্রা
রোমানিয়ার মুদ্রা। ছবি: সংগৃহীত

রোমানিয়ার মানুষ তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ এবং অতিথি আপ্যায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে খুবই সমাদৃত। বলা হয়ে থাকে, পর্যটক যাঁরা এ দেশে বেড়াতে আসেন, তাঁদের কেউ যদি স্থানীয় ভাষায় কথা বলেন, তাহলে সেখানকার মানুষেরা নাকি খুবই খুশি হন। রোমানিয়ার মানুষ অতিথিদের বিভিন্ন খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতে ভালোবাসে।

ভাষা

রোমানিয়ার আধিকারিক ভাষা রোমানিয়ান এবং রোমানিয়ান ভাষা ইতালিয়ান কিংবা ফ্রেঞ্চদের ভাষার সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। পূর্ব ইউরোপের মধ্যে রোমানিয়ান একমাত্র ভাষা, যেটি লাতিন ল্যাংগুয়েজ ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত, যার চারপাশ স্লাভিক/ইউরালিক ল্যাংগুয়েজের ফ্যামিলির জাতিগোষ্ঠী দিয়ে পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ রোমানিয়ান পূর্ব ইউরোপের মধ্যে একমাত্র রোমান ভাষা। দেশটির প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ এ ভাষায় কথা বলে থাকে। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগাল থেকে হাজারো মাইল দূরে অবস্থিত একটি দেশে কীভাবে লাতিন ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা প্রবেশ করল, সেটা নিয়ে নেহাত গবেষণা কম হয়নি। তবে এখনো এর প্রকৃত কারণ কেউ বের করতেও পারেনি।

ধারণা করা হয়, পূর্ব রোম সাম্রাজ্য তথা বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও বাইজেনটাইন রাজার সৈনিকদের এক অংশ সুউচ্চ কার্পেথিয়ান পর্বতমালার কারণে এ অঞ্চলটিকে তাঁদের জন্য নিরাপদ হিসেবে ধারণা করেছিল এবং এদের মাধ্যমে আজকের দিনের রোমানিয়ানদের গোড়াপত্তন হয়েছে। অর্থাৎ চারদিকে স্লাভিক ও ইউরালিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের দ্বারা বেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও রোমানিয়ায় এ কারণে লাতিন ভাষার প্রচলন ঘটে। আবার অনেকে মনে করেন যে রোমান সম্রাট নিরোর হাতে রোমের পতন ঘটলে রোম থেকে একদল মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সুউচ্চ কার্পেথিয়ান পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত এ অঞ্চলটিতে তাঁরা বসতি স্থাপন করতে শুরু করে, যাঁদের হাত ধরেই এ অঞ্চলটিতে লাতিন ভাষার প্রচলন ঘটে। রোমানিয়ার বাইরে রিপাবলিক অব মলদোভাতেও একটা বড় অংশের মানুষের ভাষা রোমানিয়ান। এ ছাড়াও হাঙ্গেরিয়ান, সার্বিয়ান, জার্মান, ইউক্রেনিয়ান—এসব ভাষারও প্রচলন দেশটিতে রয়েছে। যেহেতু রোমানিয়ানরা জাতিগতভাবে লাতিন এবং একই সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে চারদিক থেকে স্লাভিক ও ফিন-ইউরালিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা আবদ্ধ ও দীর্ঘদিনের অটোমান শাসনের প্রভাবের কারণে অনেকে রোমানিয়াকে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশ হিসেবে আখ্যা দেন।

রোমানিয়ার টেনিস তারকা
রোমানিয়ার টেনিস তারকা সিমোনা হালেপ। ছবি: সংগৃহীত

রোমানিয়া ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে একটি অঞ্চল যেখানে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বসবাসের প্রমাণ রয়েছে। পেশতারা কু ওয়াসে নামক একটি জায়গা রয়েছে রোমানিয়ায় যেখানে ইউরোপের মধ্যে মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো হিউম্যান ফসিলের সন্ধান পাওয়া গেছে। কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে এ হিউম্যান ফসিলের বয়স ৩৭ হাজার ৮০০ থেকে ৪২ হাজার বলে জানা গেছে। রোমানিয়ার আজকের মানচিত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে স্বাক্ষরিত ‘Treaty of Trianon’–এর মধ্য দিয়ে।

খাবার
রোমানিয়ার খাবারে তুরস্ক, গ্রিস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, ইউক্রেন, ইতালির প্রভাব লক্ষ করা যায়। ‘চরবা দে বুরতা’ রোমানিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। ওয়াইন জন্য রোমানিয়া আলাদা এক ব্র্যান্ড বিশ্বব্যাপী।

রোমানিয়ার সরকারব্যবস্থা ইউনিটারি সেমি-প্রেসিডেন্সিয়াল রিপাবলিক, যেখানে প্রধানমন্ত্রী সরকারব্যবস্থার প্রধান। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোমানিয়া সোভিয়েত আক্রমণের শিকার হয় এবং দেশটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিজম ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব নিকোলেই চশেস্কু রোমানিয়ার একসময়কার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।

জনপ্রিয় খেলা
ফুটবল রোমানিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ইউরোপের জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব স্টুয়া বুখারেস্টির পীঠস্থান রাজধানী বুখারেস্টে। এ ছাড়া টেনিস দেশটির অন্যতম আরও একটি জনপ্রিয়ও। WTA-এর র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী বর্তমানে শীর্ষে থাকা টেনিস তারকা সিমোনা হালেপ একজন রোমানিয়ান। ১৯৭৬ সালে কানাডার মন্ট্রিলে অলিম্পিকে গেমসের ইতিহাসে সর্বপ্রথম দশে দশ দেওয়া হয় রোমানিয়ার জিমন্যাস্ট খেলোয়াড় নাদিয়া এলেনা কোমানেসিকে। পাঁচটি অলিম্পিক স্বর্ণ জিতেছিলেন।

পৃথিবীর অন্যতম সেরা ড্রাইভিং রোড হিসেবে পরিচিত ট্রান্সফাগারাসান হাইওয়েটি রোমানিয়াতে অবস্থিত এবং এটি পৃথিবীর সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া ইউরোপের সবচেয়ে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ রোমানিয়ায় পাওয়া যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ ছিল রোমানিয়া।

রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট
রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট। রোমানিয়ার স্থানীয় ভাষায় পার্লামেন্টুল রোমানিয়েই বলা হয়। এটি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী নির্মাণ হিসেবে পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত

রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে কিছু মনোরম কারুকার্যবিশিষ্ট বইয়ের দোকান রয়েছে। কারটুরেসি কারুসেল বইয়ের দোকানটিতে মনে করা হয় প্রায় ১০ হাজারের মতো বই, ৫ হাজারের মতো অ্যালবাম এবং ডিভিডির মতো আরও কিছু জিনিস রয়েছে। ডাসিয়ার শেষ রাজা ডেসেবালুসের মুখচ্ছবির অনুকরণে করা শিলা ভাস্কর্যটি রোমানিয়ায় অবস্থিত। এ শিলা ভাস্কর্যটি উচ্চতায় প্রায় ১৪০ ফুটের কাছাকাছি, যা ইউরোপের উচ্চতম শিলা ভাস্কর্য। পৃথিবীর দীর্ঘতম লবণের খনি জাদুঘরটি রোমানিয়ার ক্লুজ কাউন্টিতে অবস্থিত। অদ্ভুতভাবে এ খনিটি বিভিন্ন ধরনের মেশিন এবং হাত দিয়ে খোদাই করা হয়েছে। রোমানিয়ার সিনাইয়া নামক শহরে অবস্থিত পেলেস ক্যাসেল ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে প্রথম ইলেকট্রিভাইড ক্যাসেল। এ ক্যাসেলের আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক সব কার্যকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় তড়িৎ শক্তি এ ক্যাসেলের ভেতরেই উৎপাদন করা হতো এবং এখনো সে ব্যবস্থা চালু রয়েছে। নিউইয়র্কের পর রোমানিয়ার টিমিশোয়ারা এ পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো শহর, যেখানে বৈদ্যুতিক স্ট্রিট লাইটের ব্যবহার শুরু হয়। ‘মেরি সেমেটারি’ নামক এক ধরনের কবরস্থান রোমানিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়, যা নান্দনিক শিল্পকর্মের জন্য খুবই আকর্ষণীয়। সাপানাটা গ্রামে অবস্থিত কবরস্থানটি বর্তমানে একটি ওপেন এয়ার মিউজিয়াম এবং জাতীয় পর্যটনকেন্দ্র। ব্রাশোভে অবস্থিত স্ট্রাদা সফোরি নামক সড়কটিকে এ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সরু স্ট্রিট বলে গণ্য করা হয়। এ ছাড়া সাগরপ্রেমী মানুষদের কাছে এফোরিয়ে এবং কন্সটান্টা দুটি আদর্শ জায়গা, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে।

১৯১৭ সালে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ১০ বানি নোটটিকে এযাবৎকাল পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র কাগজের মুদ্রা হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনেকে মনে করেন যে আজকের দিনে অন্যতম জনপ্রিয় খাবার স্টেকের উৎপত্তি হয়েছে রোমানিয়ায়, যদিও এ ব্যাপারে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ব্ল্যাক ম্যাজিকের ওপর ট্যাক্সও আছে
রোমানিয়ায় কালো জাদুর বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের ওপর ট্যাক্স বসানো আছে। রোমানিয়ায় সরকারিভাবে এ কালো জাদুর বা ব্ল্যাক ম্যাজিককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং যেসব মানুষ জাদুবিদ্যা কিংবা মানুষের ভবিষ্যৎ গণনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের ওপরে এ ট্যাক্স বসানো রয়েছে। এ পেশায় নিয়োজিত হতে হলে সরকার থেকে লাইসেন্স পারমিটের প্রয়োজন হয়।

নিকোলে কন্সটানটিন পাওলেস্কু
বিশ্বের মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম কৃত্রিমভাবে ইনসুলিন প্রস্তুত করা নিকোলে কন্সটানটিন পাওলেস্কু। ছবি: সংগৃহীত

রোমানিয়ার সঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত অনেক আবিষ্কার এবং বৈজ্ঞানিকের নাম জড়িত। জেট ইঞ্জিনের সর্বপ্রথম আবিষ্কার রোমানিয়ায় হয়েছিল। জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কারক ছিলেন হেনরি মারি কোয়ান্ডা। তিনি রোমানিয়ান। এ ছাড়া মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম কৃত্রিমভাবে ইনসুলিন প্রস্তুত করা নিকোলে কন্সটানটিন পাওলেস্কু একজন রোমানিয়ান চিকিৎসক। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ফাউন্টেন পেন প্রস্তুত করেন পেট্রাচে পোয়েনারু, যিনি রোমানিয়ান। জর্জ এমিল পালাদে, স্টেফান ওয়াল্টার হেল্ট, হেরটা মুয়েলার কিংবা এলিজার ইউসেলের মতো নোবেল পুরস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের জন্মও রোমানিয়ায়। স্ট্যান লির নামটির সঙ্গে পরিচয় নেই, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। হাল্ক, স্পাইডারম্যান, এক্স-মেন, থোর, ক্যাপ্টেন আমেরিকা, আইরন ম্যান, অ্যান্টম্যান, ডেডপুল, ফ্যান্টাস্টিক ফোর, ইলেকট্রা—সব জনপ্রিয় কমিক ক্যারেক্টার সিরিজ অর্থাৎ মারভেল কমিক সিরিজের স্রষ্টা স্ট্যান লিও ছিলেন একজন রোমানিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক। এ ছাড়া আইরিশ ঔপন্যাসিক ব্রাম স্টোকার রচিত বিখ্যাত চরিত্র ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ারের চরিত্রটি চিত্রায়িত হয়েছে ওয়ালাসিয়ার বিখ্যাত অর্থোডক্স রাজা ভ্লাদ দ্য ইম্পাল্যারকে অনুসরণ করে। তাঁর জন্ম রোমানিয়ার সিঘিসোয়ারাতে। পরবর্তী সময়ে এ ড্রাকুলা সিরিজের ওপর অনেক সিনেমা নির্মিত হয়েছে। ব্রাশোভ থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ব্রান নামক একটি স্থানে তিনি একটি ক্যাসেল নির্মাণ করেছিলেন, যা ‘ড্রাকুলা ক্যাসেল’ নামে পরিচিত।

এত বড় লেখার পর এতটুকু বিষয় নিশ্চিত যে রোমানিয়া সত্যিকার অর্থেই একটি অসাধারণ দেশ এবং এর সঙ্গে জড়িত কথাগুলোর পরিমাণও অনেক। তাই এ সামান্যটুকু তথ্যের সহযোগে রোমানিয়ার যাত্রা আজ এখানেই শেষ করছি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

সূত্রঃ প্রথমআলো

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!