করোনাভাইরাস: হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশি ছাত্রের সেরে ওঠার গল্প

1107
0
শামছুল ইসলাম সিপার
শামছুল ইসলাম সিপার

শামছুল ইসলাম সিপার, একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। তিনি গত সেপ্টেম্বর থেকে ‘স্টাইপেনডিয়াম হাঙ্গেরিকাম’ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের উপকণ্ঠে অবস্থিত গোডোলোতে সেন্ট ইটজভান ইউনিভার্সিটিতে অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষের মতো তিনিও ৭ এপ্রিল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। তবে এ যুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি আবার আমাদের মাঝে ফিরেও এসেছেন। ২০ এপ্রিল তিনি তার এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আজ আমরা জানবো করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার জয়ী হওয়ার দুঃসাহসিক অভিযাত্রার কথা।

সংক্রমণের শুরুটা কীভাবে হয়েছিলো এ প্রশ্নে শামছুল জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পায় অন্যান্য সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো। প্রথম দিকে তার সারা শরীরে ব্যথা অনুভূত হতে থাকে, একটানা বেশ কয়েকদিন এ উপসর্গ থাকার পর ধীরে ধীরে গলাব্যথা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তার শরীরে হালকা জ্বরও অনুভূত হয় বলে তিনি জানান।

শুরুতে স্থানীয় হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরত্ব দেয়নি। ইউরোপে শীতের শেষে এখন বসন্তের আগমন ঘটছে এবং বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়ছে। তাই এ অবস্থায় এরকম লক্ষণ যে কোনও সাধারণ ফ্লুর অভিব্যক্তি হতে পারে বলে তারা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু এর কয়েক দিনের মাথায় আনুমানিক সাত থেকে দশ দিন পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। ডায়ারিয়াসহ জ্বর ও শ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দেয়।

তখন তাকে স্থানীয় হাসপাতাল ‘সান্টামেদ ক্লিনিকাতে’ নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি যাতে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারেন সেজন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়। এ পর্যায়ে চিকিৎসকরা তার শরীরে কোভিড-১৯ এর টেস্ট করেন এবং নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পজিটিভ ধরা পড়ে। তবে সংক্রমণ খুব একটা মারাত্মক পর্যায়ে ছিলো না বলে তাকে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এজন্য তাকে হাসপাতালে না থেকে বাসায় সেলফ আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কীভাবে শামছুলের শরীরে এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, তার এক রুমমেট কয়েকদিন আগে জার্মানি আর সুইজ্যারল্যান্ড ভ্রমণ করে এসেছিলেন। তার মাধ্যমে তার শরীরে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে। তার রুমমেটও নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যদিও তার এ সংক্রমণ শামছুলের মতো খুব একটা গুরুতর পর্যায়ে ছিলো না।

কেমন যাচ্ছিলো সেলফ আইসোলেশনে থাকা দিনগুলো এ প্রশ্নের উত্তরে শামছুল জানান, প্রবাস জীবন হচ্ছে এমন যে জীবন পাড়ি দিতে হয় বাবা-মা কিংবা পরিবারের কোনও সদস্য ছাড়া সম্পূর্ণ একাকী। সেরকম একটি জীবনে সাধারণ জ্বরই হয়ে উঠে অনেক বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এছাড়া তিনি যেহেতু ডরমেটরিতে বসবাস করতেন এবং ডরমিটরি বলতে গেলে একটি পাবলিক প্লেস যেখানে আসলে সে অর্থে আইসোলেশনের সুযোগ খুবই কম, তাই প্রথম দিকে যখন তিনি সংক্রমিত হন তখন দুশ্চিন্তা কাজ করছিলো যে আদৌ কতোটুকু তিনি সেলফ আইসোলেশন নিশ্চিত করতে পারবেন।

পরে অবশ্য তার ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে আটটি ডরমিটরির মধ্যে দুইটিকে সম্পূর্ণ লক করে দেওয়া হয়। যেহেতু হাঙ্গেরির সরকার করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করার জন্য সম্পূর্ণ হাঙ্গেরিকে জরুরি অবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে এবং দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাই হাঙ্গেরির স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই তাদের বাসায় ফিরে যায় এবং ইরাসমাস প্লাসসহ বিভিন্ন একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রামে আসা অনেক শিক্ষার্থীও তাদের নিজ দেশে চলে যায়।

তাই ডরমিটরিতে যে সব সিট ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো সেগুলোতে সাময়িক সময়ের জন্য অন্যান্য শিক্ষার্থীদের পুর্ণবিন্যাস করা হয়েছিল। শামছুলের রুমের মধ্যেই নিজস্ব ওয়াশরুম এবং নিজস্ব রান্নাঘরের ব্যবস্থা থাকায় পরবর্তীতে তাকে আর কোনও বেগ পেতে হয়নি সেলফ আইসোলেশন পালন করার ক্ষেত্রে।

কীভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এ প্রশ্নের পাশাপাশি অসুস্থ থাকার দিনগুলোতে তার অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হলে শামছুল জানান, তিনটি জিনিস তাকে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ভুগিয়েছে। প্রথমত, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট ডায়ারিয়া যেটি আসলে কোনও ধরণের ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয় না। জ্বর কিংবা কাশি অথবা শরীরের কোনও অংশে ব্যথা অনুভূত হলে প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, পেইন কিলার বা কাশির ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এসব উপসর্গ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া গেলেও ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে কোনও ধরণের ওষুধ কাজ করে না।

এছাড়া গলাব্যথার কারণে যে কোনও খাবার খেতে কষ্ট হয়। শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। শামছুল যখন নিঃশ্বাস নিতেন অনুভব করতেন যে তার বুকের ভেতর কোনও একটি অংশ পুড়ে যাচ্ছে। তবে করোনাভাইরাস পজিটিভ প্রমাণ হওয়ার পর দশ থেকে এগারো দিনের মাথায় আচমকা তিনি লক্ষ্য করেন যে রাতারাতি এসব উপসর্গ চলে গেছে। মূলত এ ভাইরাসের লাইফ সাইকেল দশ থেকে চৌদ্দ দিন এবং এসময় কোনও ব্যক্তির শরীরে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে তাহলে কোনও ধরণের সেকেন্ডারি সমস্যা (অনেকের ক্ষেত্রে যেমন নিউমোনিয়ার সমস্যা দেখা দেয়) আক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেন বলে জানান শামছুল। পজিটিভ ধরা পড়ার পর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আরও একবার টেস্ট করে নিশ্চিত করা হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠেছেন কিনা।

যখন তাকে সেলফ আইসোলেশনে পাঠানো হয় তিনি সব ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফোন কল অথবা গণমাধ্যম জাতীয় জিনিস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সচেষ্ট হন। এভাবে ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা থেকে অনেকটা নিজেকে সরিয়ে রাখা যায় বলে দাবি করেন শামছুল। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না বলে জানান। নামাজ, কুরআন পাঠ ও বিভিন্ন ধর্মীয় ইবাদাতের মধ্য দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতেন তিনি।

এসময় তিনি কী ধরণের খাবার খেতেন জানতে চাওয়া হলে শামছুল জানান, গলাব্যথার কারণে খাবার খেতে সমস্যা হতো। তাই তিনি চেষ্টা করতেন যতোটা সম্ভব নরম খাবার যেমন নরম ভাত, সুজি, সাবুদানা ইত্যাদি খেতে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি, ফলমূল ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার, ভিনেগার, দুধ এজাতীয় জিনিসগুলো তার খাবারের তালিকায় ছিলো। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্রায় সব ধরণের খাবার তিনি গরম অবস্থায় খেতে চেষ্টা করতেন, ফলে মাঝে মধ্যে তিনি তার গলায় এক ধরণের ক্ষত অনুভব করতেন বলে জানান। যেহেতু ভিটামিন সি ও ভিনেগার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে তাই এসময় তিনি বেশি করে ভিনেগার ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে তার কাছে পরামর্শ চাওয়া হলে সবার প্রথমে তিনি উল্লেখ করেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা, পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির সাধারণ যে নিয়ম যেমন নিয়মিত সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ইত্যাদির কথা জানান। যেহেতু এ ভাইরাসটি বাতাসের মাধ্যমে বেশি ছড়ায় বিশেষ করে হাঁচি কাশির মাধ্যমে তাই তিনি এ ধরণের পরিস্থিতিতে বাইরে বের হওয়ার সময় সবাইকে মাস্ক পরার পাশাপাশি হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

কোভিড-১৯ এর কার্যকরি চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি এবং শামছুল নিজেও যখন বিভিন্ন সময় চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন প্রত্যেকবারই এ একই উত্তর আসছিলো তাদের পক্ষ থেকে। তাই তার মতে এ অবস্থায় একমাত্র ভ্যাকসিন হচ্ছে ঘরে অবস্থান করা এবং খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাসা থেকে বাইরে বের না হওয়া। এছাড়া প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, পেইন কিলার জাতীয় ওষুধগুলো সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে হাতের কাছে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। যদি কারও শ্বাসজনিত কোনও সমস্যা থাকে তাহলে তার সঙ্গে সব সময় নেবুলাইজার রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।

শামছুল জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে উঠার জন্য মানসিক দৃঢ়তার কোনও বিকল্প নেই। একমাত্র আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মানসিক বলই পারে এ কোভিড-১৯ থেকে অনেকটা সুস্থ করে তুলতে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

এ জটিল পরিস্থিতিতে পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান শামছুল। বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর রাহাত বিন জামানের কথা স্মরণ করেন তিনি। শামছুল জানান, এ পরিস্থিতিতে প্রতিদিন তিনি যোগাযোগ করতেন ও অনুপ্রেরণা যোগাতেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যাতে ইতালি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যাপক হারে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি না ঘটে সেজন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান এ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

সূত্রঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!